গল্প: হতভাগা পর্ব: ১০ লেখক: গিয়াস_উদ্দিন_আহাম্মদ






 গল্প: হতভাগা

পর্ব: ১০
লেখক: গিয়াস_উদ্দিন_আহাম্মদ



ঢাকা শহরের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে শায়লা রহমান তার মুঠোফোনের স্ক্রীনে কয়েকটি ফাইল স্ক্যান করে। মুখে ক্ষণিকের হাসি, কিন্তু সেই হাসি এক ধরনের ক্ষোভ আর প্রতিশোধের। তিনি জানতেন, নাদিয়ার উত্থান তাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে, কিন্তু কিছু অর্জনের জন্য কিছু হারাতে হয়।

শায়লা ফোনে বললেন—

“আপনারা কি প্রস্তুত? ‘শিকড়’ প্রজেক্টের বিরুদ্ধে আমি যে অভিযোগ তুলেছি, তা বাস্তবায়িত হলে নাদিয়া শেষ হয়ে যাবে।”

তিনি তাঁর সাহায্যকারীকে নির্দেশ দিলেন, “এখনই মিডিয়াতে এই খবরটি ফাঁস করো। নাদিয়াকে একদম কোণঠাসা করতে হবে। এই পৃথিবীতে কেউ সহজে উঠে আসে না। তাকে যদি নষ্ট করতে চাই, তবে তার অতীতকে কাজে লাগাতে হবে।”



কনফারেন্স শেষে ঢাকা ফিরে এসে, নাদিয়া সেদিন রাতেই ফোনে শায়লার অভিযোগের বিষয়ে জানতে পারে। মিডিয়াতে একটি শিরোনাম ভাসতে থাকে—

“শিকড় প্রজেক্টের পেছনে অবৈধ অনুদান, নাদিয়া এক মাফিয়াদের অংশ?”

এ খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে নাদিয়ার জীবনে এক নতুন ঝড় আসে। সংবাদপত্রে, টিভিতে, সোশ্যাল মিডিয়ায়, তার নামে উঠতে থাকে একের পর এক অভিযোগ। শুধু কটূক্তি নয়, তার প্রতি নেতিবাচক মনোভাবও তৈরি হতে থাকে। তার দলের কিছু সদস্যও সন্দেহ করতে শুরু করেন, অনেকেই তাঁকে সরাসরি প্রশ্ন করতে থাকেন—

“আপনি কী জানতেন এসব?”

নাদিয়া জানত, শায়লার এই চক্রান্ত শুধু তার নয়, শিকড় প্রজেক্টের প্রতিটি সদস্যের ওপর আঘাত। কিন্তু সে কখনো হাল ছাড়বে না। এবার তার বিরুদ্ধে একটা বড় লড়াই অপেক্ষা করছে।



সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি লাইভ সেশন শুরু করে নাদিয়া। তার চোখে দৃঢ়তা, কথায় নির্ভীকতা ছিল।

“আজ যে প্রশ্নগুলো ওঠানো হচ্ছে, আমি জানি আপনারা অনেকেই সেই প্রশ্নের উত্তর চান। আমি শুধু আপনাদের বলব, আমার ও আমার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আনা কোনো অভিযোগ যদি সত্য হয়, আমি নিজে নিজের বিরুদ্ধে মামলা করবো। কিন্তু যতটুকু জানি, ‘শিকড়’ প্রজেক্ট একটিই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে—এ পৃথিবীটাকে আরও সুন্দর করা।”

নাদিয়া কাঁপা কাঁপা হাতে ফোন থামায়। তিনি জানতেন, এখন শুধু তার নিজস্ব সততা, কঠোর পরিশ্রম ও প্রমাণের ওপর ভরসা রাখতে হবে।



রায়হান ফিরে এসে নাদিয়াকে আশ্বস্ত করে। দুই জনেই জানতেন, শায়লার চক্রান্ত থামানোর একমাত্র উপায় হল সঠিক প্রমাণ বের করা। রায়হান ফোনে তার আন্তর্জাতিক সহযোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে, বলে—

“আমরা শায়লার সব কর্মকাণ্ডের ওপর নজর রাখব। যারা আমাদের বিরুদ্ধে কাজ করছে, তাদের বিরুদ্ধে প্রমাণ চাই। সময় লাগবে, কিন্তু আমরাও হাল ছাড়ব না।”

এমন কঠিন সময়ে রায়হান নাদিয়ার পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমে তার প্রতি এক অদৃশ্য বন্ধন আরও দৃঢ় হয়ে ওঠে।



“শিকড়” প্রজেক্টের সদস্যরা তাদের কাজ চালিয়ে যেতে শুরু করে, তবে এখন তাদের কাজের মধ্যে রয়েছে এক নতুন তীব্রতা। প্রতিটি সিদ্ধান্ত, প্রতিটি উদ্যোগ যেন আরও বেশি দৃষ্টির মধ্যে ছিল। স্কুলে নতুন শিশুদের ভর্তি, অঙ্গীকারের ভাষা—সবকিছুই প্রতিকূল পরিস্থিতি সত্ত্বেও চালু রাখছিল নাদিয়া।

একদিন, প্রজেক্টের এক কর্মী—ফারহান—নাদিয়াকে জানায়, “ম্যাডাম, শায়লা রহমানের বিরুদ্ধে কয়েকটি প্রমাণ পেয়েছি। আপনি কি চান আমরা এগুলোর ওপর কাজ করি?”

নাদিয়া মাথা নিচু করে, কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর বলল—

“হ্যাঁ, আমরা শয়তানের বিরুদ্ধে কিছু একটা করতে পারব। তবে আমাদের পথ সঠিক থাকতে হবে।”

এটি ছিল তার প্রথম সত্যিকার প্রতিশোধের মুহূর্ত, কিন্তু নাদিয়া জানত, এখনই তাকে সকল প্রমাণ পাবার চেষ্টা করতে হবে, যাতে পরিস্থিতি তার বিপক্ষে না চলে যায়।



এদিকে, আরিজ তার জীবনের এক বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। স্কুলের বন্ধুরা এবং সমাজের নানা পক্ষ থেকে, তার মা নাদিয়ার বিরুদ্ধে কথা শোনা যাচ্ছিল। কিন্তু আরিজ জানত, মা কখনো কোনো অন্যায় করেননি।

সে একদিন মায়ের কাছে এসে বলল—

“মা, আমি তোমার পাশে আছি। তুমি সত্যি জানো, আমি জানি তুমি আমাদের জন্য সব করতে।”
“তবে, আমি আর তোমার সাথে থাকব, আজ থেকেই তোমার প্রজেক্টের বিষয়ে আরও বেশ কিছু দায়িত্ব নিতে চাই।”

আরিজের কথাগুলো নাদিয়াকে স্তম্ভিত করে দেয়। সে জানত, তার সন্তান আরও বড় হয়ে উঠছে। আরিজের সাহসিকতা তার পরিবারকে নতুন আশার আলো দেখায়।



এবার নাদিয়া এবং তার দলকে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হতে হয়। দেশি এবং আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠানকে সঙ্গে নিয়ে তারা শায়লা রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্ত করতে শুরু করে।

রায়হান বলল—

“এটা শুধু ‘শিকড়’ প্রজেক্টের লড়াই নয়, এটা সারা বাংলাদেশের সেই সব মানুষের লড়াই, যারা নিজেদের অধিকার চেয়ে প্রতিনিয়ত সমাজের রুখে দাঁড়িয়ে থাকে।”



শায়লা রহমানের বিরুদ্ধে সমস্ত প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়ে গেলে, সেই তথ্য সাংবাদিকদের সামনে পেশ করা হয়। মিডিয়ায় শ্বেতসন্ধ্যার আলোয় আসতে থাকে শায়লার সব অন্ধকার দিক।

নাদিয়া জানত, এই লড়াইয়ের জয়ী হতে হলে একে একে প্রতিটি ধাপ সফলভাবে অতিক্রম করতে হবে। কিন্তু সে আশাবাদী ছিল যে একদিন তার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে।


চলবে...
গল্প: হতভাগা
পর্ব: ১০
লেখক: গিয়াস_উদ্দিন_আহাম্মদ



গল্প: হতভাগা পর্ব: ৯ লেখক: গিয়াস_উদ্দিন_আহাম্মদ

 



গল্প: হতভাগা
পর্ব: ৯
শিকড়ের ডালপালা
লেখক: গিয়াস_উদ্দিন_আহাম্মদ


১. এক নতুন ভোর

ঢাকার গুলশান এক্সিকিউটিভ কনফারেন্স হলে আজ ভিড় জমেছে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধি, মিডিয়া, এবং এনজিও নেতাদের। মঞ্চে উঠছেন এক নারী—তার গায়ে সাদা সালোয়ার-কামিজ, মুখে দৃঢ়তা, চোখে আত্মবিশ্বাস।

নাদিয়া।

তিনিই “হতভাগা”র প্রতিষ্ঠাতা এবং “শিকড়” প্রজেক্টের মুখ।

তাঁর বক্তব্যে তিনি বলেন:

“আজ আমি এখানে এসেছি একজন মা হিসেবে, একজন কলঙ্কিনী হিসেবে নয়। আমি জানি কীভাবে সমাজ আমাদের মতো মানুষদের তিরস্কার করে। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, শিকড় যত গভীর, গাছ তত দৃঢ় হয়।”

ঘরে তখন করতালির ঝড়।


২. ‘শিকড়’ প্রজেক্ট কী?

‘শিকড়’ প্রজেক্ট মূলত পথশিশু, অবৈধ জন্মপ্রাপ্ত শিশু, গুম হওয়া পিতামাতার সন্তান, এবং সমাজবঞ্চিত শিশুরা যাতে আত্মপরিচয় পায়, শিক্ষা পায়, আইনি সহায়তা পায়—সে লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়।

এখানে নাদিয়ার সন্তান আরিজ এই প্রজেক্টের মুখপাত্র হিসেবে শিশুদের অধিকার নিয়ে কথা বলে জাতিসংঘের সেমিনারে।

সে বলে—

“আমরা বাবা-মায়ের পরিচয়ে না, আমাদের স্বপ্নের পরিচয়ে বাঁচতে চাই।”

সারা হল দাঁড়িয়ে পড়ে।


৩. আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

জাতিসংঘের শিশু অধিকার ফোরাম (UNCRC) “শিকড়” প্রজেক্টকে South Asian Model Initiative হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

এরপর ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘Human Dignity Award’ এর জন্য “হতভাগা” মনোনীত হয়।

ফ্রান্সের বিখ্যাত মানবাধিকার কর্মী Élise Fournier বলেন—

“বাংলাদেশে নাদিয়া যা করেছেন, তা একাই এক বিপ্লব। আমরা তাঁর পাশে আছি।”

এমন সময়ই গল্পে আসে এক নতুন মোড়।


৪. নতুন প্রতিপক্ষ

একটি প্রভাবশালী স্থানীয় NGO—“নতুন দিগন্ত”, যারা দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি অনুদানে চলে আসছে, হঠাৎ নাদিয়ার উত্থানে ক্ষুব্ধ হয়।

তাদের পরিচালক শায়লা রহমান বলেন এক গোপন মিটিংয়ে—

“একটা মেয়ের অতীত যতই কলঙ্কে ভরা হোক, মিডিয়া তাকে মহান বানিয়ে ফেলছে। ওর প্রতিষ্ঠানের পেছনে যদি আমরা দুর্নীতির প্রমাণ পাই, তবে সব শেষ হয়ে যাবে।”

তারা তদন্ত শুরু করে, আর কিছু ঘুষখোর মিডিয়া ব্যবহার করে ‘হতভাগা’র কিছু কর্মীর বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তোলে।


৫. আরেক মুখোমুখি যুদ্ধ

নাদিয়া দেখেন, আন্তর্জাতিক পুরস্কারের আগেই তার বিরুদ্ধে “স্বেচ্ছাচারিতা, অনুদানের অপব্যবহার, এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের” মামলা দায়ের হয়।

রায়হান বলেন—

“এটা সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা। তুমি তাদের জায়গা কাড়ছো, এখন তারা তোমার জায়গা নিতে চায়। কিন্তু তুমি হাল ছেড়ো না।”

নাদিয়া নির্ভয়ে মুখোমুখি হন আদালতের।

তার হয়ে আইনি সহায়তা দেয় এক ব্রিটিশ আইনজীবী David Moore, যিনি আগেই “শিকড়” প্রজেক্টে স্বেচ্ছাসেবক ছিলেন।


৬. সামাজিক প্রতিবাদের ঢেউ

সোশ্যাল মিডিয়ায় #আমার_শিকড় ট্রেন্ড হয়ে যায়। হাজার হাজার মানুষ তাদের বাবা-মায়ের পরিচয়হীনতা, অবজ্ঞা, অথবা সমাজের কাছে অবমাননার গল্প শেয়ার করতে থাকে।

নাদিয়া বলেন:

“আমি কারও শত্রু না, আমি শুধু চেয়েছিলাম সন্তানদের সম্মান নিয়ে বড় করতে। যদি তাই অপরাধ হয়, আমি সেটাও মেনে নেব।”


৭. মুখোমুখি নাদিয়া ও শায়লা

একটি বিতর্কিত টকশোতে দুই সংগঠক—নাদিয়া ও শায়লা মুখোমুখি হন।

শায়লা বলেন—

“আপনি একজন অপরাধীর সন্তানকে সামনে রেখে আবেগের ব্যবসা করছেন।”

নাদিয়া জবাব দেন—

“আপনি হয়তো সিল্ক শাড়ি পরে সমাজসেবা করেন। আমি কলঙ্ক বুকে নিয়ে মানুষ গড়ি।”

সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইভ সেই রাতেই ৫০ লাখ মানুষ দেখে। জনসমর্থন যায় নাদিয়ার দিকে।


৮. পুরস্কারের রাত

“হিউম্যান ডিগনিটি অ্যাওয়ার্ড” গ্রহণের জন্য জেনেভায় এক অভিজাত অনুষ্ঠানে নাদিয়া ও আরিজ উপস্থিত।

নাদিয়া বলেন—

“আমার পরিচয় আমি ‘হতভাগা’। কিন্তু এই পরিচয়েই আমি গর্বিত, কারণ তা শুধু আমার না, সমাজের হাজারো ‘অপরিচিত’ মুখের। আজ আমরা কথা বলছি, কাল তারা নিজের পরিচয়ে দাঁড়াবে।”


৯. শেষ দৃশ্য: শিকড় ছড়িয়ে পড়ছে

ঢাকায় ফিরে এসে নাদিয়া দেখেন, দেশের ১৪টি জেলায় ‘শিকড়’ প্রজেক্টের শাখা চালু হয়েছে।

একজন স্বেচ্ছাসেবী এসে বলে—

“আপার নাম শুনে তো গ্রাম থেকে এক বাচ্চা মেয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে এসেছে, বলে—আমি ‘হতভাগা’র স্কুলে পড়তে চাই।”

নাদিয়া চেয়ে থাকেন দূরের দিকে। তার চোখে জল।

রায়হান পাশে এসে দাঁড়ায়, বলে—

“তোমার অতীত তোমার ওজন ছিল। আজ সেটা তোমার ডানায় পরিণত হয়েছে।”


চলবে…


গল্প: হতভাগা
পর্ব: ৯
লেখক: গিয়াস_উদ্দিন_আহাম্মদ



গল্প: হতভাগা পর্ব: ৮ লেখক: গিয়াস_উদ্দিন_আহাম্মদ

 



গল্প: হতভাগা
পর্ব: ৮
শিকড়ের দিকে ফিরে দেখা
লেখক: গিয়াস_উদ্দিন_আহাম্মদ



“মা, আমি তো বলেছিলাম না, আমাকে তোমার মতো হতে হবে না। আমি আমার মতো হয়ে উঠবো।”
— এই কথা বলে ১০ বছর বয়সী আরিজ দরজা ধাক্কা দিয়ে বেরিয়ে যায়।

নাদিয়া চুপচাপ বসে থাকে। সামনে জন্মদিনের কেক, পাশে রায়হান, আর চারপাশে ‘হতভাগা’র মেয়ে ও ছেলে সদস্যরা—কিন্তু যেন উৎসবের মাঝে ছায়া নেমে আসে।

আজ আরিজের জন্মদিন। দশ বছর পার হয়েছে। একটি শিশুর বেড়ে ওঠা, তার হাজারো প্রশ্ন, সমাজের কটুকথা, বাবার অনুপস্থিতি—সবকিছুকে পাশ কাটিয়ে সে আজ স্কুলের সেরা ছাত্রদের একজন।

কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে আরিজের মধ্যে অদ্ভুত পরিবর্তন।

সে একা থাকে, বই পড়ে, কোনো প্রশ্ন করলে জবাব দেয় না। মাঝে মাঝে চিৎকার করে ঘুম ভেঙে যায়।

রায়হান বলে—
— “ওর ভিতরে কিছু চাপা পড়ে আছে। সময় এসেছে, ওর সাথে সত্যি কথা বলার।”

নাদিয়া আরিজের রুমে ঢোকে। দেয়ালে আঁকা ছবি—একটা পাহাড়, যার নিচে দাঁড়িয়ে আছে এক শিশু, আর সামনে একটি অন্ধকার গুহা।

নাদিয়া জিজ্ঞেস করে—
— “তুমি কি ভয় পাচ্ছো আরিজ?”

আরিজ চুপ থাকে।

— “তোমার কী জানতে ইচ্ছে করে, তোমার বাবা কে? কেন কেউ আসেনা তোমার জন্মদিনে?”

আরিজ ধীরে ধীরে ঘাড় তোলে—
— “মা, আমার স্কুলে আজ কেউ বলেছে, ‘তোর তো বাবা নেই, তোর মা তো… তুমি জানো না, তুমি কার সন্তান।’ আমি জানতে চাই। তুমি আমাকে এতদিন লুকিয়ে রেখেছো।”

নাদিয়ার মুখ শুকিয়ে যায়।

সে বলে—
— “তুমি আমার প্রাণ, আমার অন্ধকার সময়ের আলো। কিন্তু হ্যাঁ, তোমার জন্ম সহজ ছিল না। তোমার জন্ম আমার লাঞ্ছনার সাক্ষী, কিন্তু ভালোবাসারও।”

আরিজ বলে—
— “আমি জানি না আমি কার সন্তান, মা। কিন্তু আমি জানতে চাই—সে কোথায়? সে কে?”



নাদিয়া কাঁপা হাতে একটা ধূলিধূসর বাক্স বের করে। সেখানে রাখা পুরোনো ডায়েরি, হাসপাতালের রিপোর্ট, মামলার কাগজপত্র—আর একটি অজানা চিঠি।

চিঠিতে লেখা:
“নাদিয়া,
তুমি যেটা করছো, সেটা সমাজের চোখে অপরাধ হতে পারে। কিন্তু আমার কাছে তুমি এক যোদ্ধা। আমি যদি কখনও আরিজকে দেখে যেতে না পারি, তার জন্য ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। কিন্তু আমি জানি, তুমি তাকে মানুষ করবে, ঠিক আমার মতো নয়—তোমার মতো।”


(এক সময়ের বাড়ির ড্রাইভার, যার সাথে ঘনিষ্ঠ হয়েছিল নাদিয়া… যার বিরুদ্ধে কেউ কখনও মামলা করেনি, কারণ সে অদৃশ্য হয়েছিল)।

রায়হান তখন চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। সে বলে—
— “তুমি আমাকে কখনো বলেনি, সে এক ধর্ষণ ছিল, নাকি সম্মতি ছিল?”

নাদিয়া বলে—
— “আমি নিজেও বুঝিনি। একাকীত্ব, শূন্যতা, অবহেলা—এসবের ভেতর দিয়ে একজন মানুষ কখন কতটা ভেঙে পড়ে, তা বোঝা যায় না। কিন্তু হ্যাঁ, আমি কোনোদিন বাধ্য হইনি, আবার সজ্ঞানেও ছিলাম না। তাই আমি তাকে কখনো দোষ দিইনি।”



পরদিন আরিজ এসে জানায়—
— “আমি বাবাকে খুঁজে বের করবো, মা। যদি সে বেঁচে থাকে, আমি তার মুখোমুখি হতে চাই।”

নাদিয়া বাধা দেয় না।

রায়হান সহায়তা করে। তারা খোঁজ নিতে শুরু করে—নাম, ঠিকানা, পুরনো বন্ধুদের স্মৃতি, গুমের তালিকা।

অবশেষে এক সন্ধ্যায় একটি NGO থেকে খবর আসে—“আমরা একজন মানুষের সন্ধান পেয়েছি, যিনি ১০ বছর আগে একটি আশ্রমে ছিলেন মানসিক ভারসাম্য হারানো অবস্থায়। তার নাম পাওয়া যায়নি, কিন্তু তিনি বারবার বলে যান, ‘আমার ছেলেকে আমি খুঁজে পাবো...’”



নদীর পাশে একটি পরিত্যক্ত শ্মশান ঘরে ছোট্ট কুঁড়ে তৈরি। সেখানে বসে আছে একজন বৃদ্ধ, মুখে দাড়ি, গায়ে ময়লা চাদর।

আরিজ তাকে দেখে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে।

সে সামনে গিয়ে বলে—
— “তুমি কি আমাকে চেনো?”

বৃদ্ধ তাকিয়ে দেখে, তারপর ফুঁপিয়ে ওঠে।

— “তুই... তুই আলো! আমি তোর জন্যই বেঁচে ছিলাম। তুই আমার ভুলের ফল না, তুই আমার বাঁচার কারণ।”

নাদিয়া এসে দাঁড়ায়, কাঁদে।

সানজিদ বলে—
— “আমি কোনোদিন ক্ষমা পাবো না। আমি তো তোর মা'কে ভালোবেসেছিলাম, কিন্তু নিজের সীমা ভুলেছিলাম। তারপর সমাজ, ঘৃণা, ভয় আমাকে পাগল করে দিয়েছিল।”

আরিজ বলে—
— “তুমি যদি ভুল করে থাকো, তবে আমার জন্ম কি শুধুই দুঃখ?”

নাদিয়া বলে—
— “না, তুমি আমার জীবন। সে যাই হোক, তুমি মানুষ, আর তুমি জানার অধিকার রাখো কে তোমার শিকড়।”



ফিরে আসার পথে একদল সাংবাদিক রেকর্ড করে সবকিছু।
খবরের শিরোনাম হয়:
"হতভাগার প্রতিষ্ঠাতা একজন ধর্ষকের সন্তানের মা?"
"শিশুকে সত্য বলার শিক্ষা, নাকি অপরাধীর সাথে পুনর্মিলন?"

সরকারি অনুদান স্থগিত। সামাজিক আন্দোলন শুরু হয়। নাদিয়াকে হয়রানি শুরু হয়।

UNHCR আর্থিক সহায়তা বন্ধের হুমকি দেয়।

রায়হান বলে—
— “তুমি কি চাইছো আমি তোমাদের থেকে সরে যাই?”

নাদিয়া বলে—
— “না। আমি আরিজকে সত্য শিখিয়েছি, কিন্তু সমাজের মুখে তালা দিতে পারিনি। এখন যদি আমরা চুপ থাকি, তবে ওর সাহসও মরে যাবে।”


নাদিয়া সংবাদ সম্মেলন ডাকেন।

তিনি বলেন—
— “আমি একটি শিশু জন্ম দিয়েছিলাম, ঘৃণার মধ্যে থেকে। কিন্তু আমি তাকে ভালোবাসা দিয়েছি। আমি চাইনি আমার সন্তান প্রতিশোধে বড় হোক, চাইনি সে ঘৃণা করতে শিখুক। আজ যদি সমাজ আমার মুখ দেখে বলে আমি অপরাধী, তবে বলি—হ্যাঁ, আমি অপরাধ করেছি—একটি সন্তানকে বাঁচিয়ে তোলা, তাকে সত্য শেখানো।”

তারপর আরিজ মাইক হাতে নেয়—
— “আমি যদি অপরাধের ফল হই, তবে আমি সেই অপরাধকেই পরিবর্তন করে মানবতার মুখ করবো।”

হল স্তব্ধ।



UNHCR পুনরায় বিবৃতি দেয়—“আমরা সহানুভূতিশীল পরিবার ও মানসিক পুনর্গঠনের এই মডেলকে সমর্থন করি।”

‘হতভাগা’ আরও বড় উদ্যোগ নেয়—শিশুদের জন্য ‘শিকড়’ প্রজেক্ট, যেখানে অবৈধ, অস্বীকৃত, গুম হওয়া বা পরিচয়হীন বাবা-মায়ের সন্তানদের পরিচয়-প্রাপ্তির এবং মানসিক শক্তি গঠনের কাজ হবে।

নাদিয়া আর আরিজ হাতে হাত রেখে হাঁটে—
সানজিদ দূর থেকে হাসে, এবং অন্ধকারের মধ্য থেকে ছায়া সরে যায়।


চলবে…
গল্প: হতভাগা
পর্ব: ৮
লেখক: গিয়াস_উদ্দিন_আহাম্মদ



পর্ব: ৭ গল্প: হতভাগা লেখক: গিয়াস_উদ্দিন_আহাম্মদ

 



গল্প: হতভাগা
পর্ব: ৭
নতুন পথ, পুরোনো ছায়া
লেখক: গিয়াস_উদ্দিন_আহাম্মদ



সকালবেলা ‘হতভাগা স্কিল একাডেমি’র মূল ফটকে এক অচেনা গাড়ি এসে থামে। গাড়ি থেকে নামল সুসজ্জিত এক যুবক—গা শিরশিরে ঠান্ডা চোখ, পরিপাটি পোশাক, হাতে দামি ঘড়ি, কাঁধে ব্যাগ।

তিনি সোজা রিসিপশনে এসে বলেন—
— “আমি আরমান হোসেন। UNHCR-এর পক্ষ থেকে এসেছি। আশ্রয়কেন্দ্র পরিদর্শন ও সহায়তা পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করতে চাই।”

রায়হান এবং নাদিয়া বিস্মিত। এতদিনে আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থা তাদের প্রতিষ্ঠানের প্রতি আগ্রহ দেখাল?
আরমানকে বসানো হয় সভাকক্ষে। কাগজপত্র, প্রজেক্ট রিপোর্ট, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সব উপস্থাপন করা হয়।

আরমান মনোযোগ দিয়ে সবকিছু দেখে বলেন—
— “আমি সত্যিই অভিভূত। বাংলাদেশে এমন মানবিক কাজ খুব কম দেখা যায়। UNHCR একাধিক প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে—বিশেষত নারী পুনর্বাসন ও ক্ষমতায়ন নিয়ে। ‘হতভাগা’ আমাদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে।”

নাদিয়া মাথা নিচু করে ধন্যবাদ জানায়।

তবে রায়হানের মনে একটা কাঁটা যেন খচখচ করে। যুবকের চোখে যেন কিছু লুকানো কুয়াশা।



চায়ের ফাঁকে আরমান বলেন—
— “আপনারা জানেন, একজন অসহায় নারী যখন নিজের পায়ে দাঁড়ায়, তখন সে শুধু নিজেকে না, একটা প্রজন্মকে বাঁচায়। UNHCR চায়, আপনাদের এই উদ্যোগকে দক্ষিণ এশিয়ার রোল মডেল হিসেবে তৈরি করতে।”

নাদিয়ার চোখ জ্বলে ওঠে—
— “এমন স্বীকৃতি যদি পাই, তবে সমাজের চোখ খুলবে। আমাদের আর বলতে হবে না—আমরা ‘হতভাগা’ নই, আমরা ভাগ্য নির্মাতা।”

আলোচনা শেষে আরমান নাদিয়ার দিকে তাকিয়ে বলেন—
— “আপনার গল্প আমি জানি। আপনি আমার জন্য এক অনুপ্রেরণা। কিন্তু আমি এসেছি শুধু দায়িত্ববোধ থেকে না, আরও কিছু আছে…”

নাদিয়া চমকে ওঠে।

আরমান নিচু স্বরে বলে—
— “আমি আপনাকে আগে থেকেই চিনতাম। আমি ছিলাম আপনার প্রাক্তন কলেজমেট—তখন আমি ছিলাম অনামিকা নামে পরিচিত। হ্যাঁ, আমি ট্রান্সজেন্ডার।”

ঘরে নিস্তব্ধতা।

রায়হান চোখ বড় করে তাকিয়ে থাকে।

নাদিয়া ধীরে ধীরে বলে—
— “তুমি… তুমি সেই অনামিকা? যে নাকি চুপচাপ থাকতো, কারো সাথে মিশতো না, আর সবাই তাকে কটাক্ষ করতো?”

আরমান মাথা নাড়ে—
— “হ্যাঁ। তুমি একমাত্র যে আমাকে ‘লুকিয়ে থাকা ফুল’ বলেছিলে। সেই সাহসী কথাটাই আমাকে গড়েছে।”



সন্ধ্যা। অফিসঘর ফাঁকা। নাদিয়া একা বসে। দরজা খুলে আরমান আসেন।
নাদিয়া বলেন—
— “তোমার পরিবর্তন দেখে অভিভূত হয়েছি। তুমি তো এক সময় আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলে... মনে আছে সেই ছাদে দাঁড়ানো সন্ধ্যাটা?”

আরমান হেসে ফেলে—
— “তোমার ফোনটাই আমাকে ফিরিয়ে এনেছিলো। তুমি বলেছিলে, ‘যদি সবাই তোমাকে না বোঝে, তার মানে তুমি আলাদা নও, ওরা অন্ধ।’ সেই কথাটা আমার পৃথিবী বদলে দেয়।”

নাদিয়ার চোখে জল। এতগুলো বছর পর পুরোনো বন্ধুকে খুঁজে পেয়ে যেন একটুকরো চাঁদ খুঁজে পেল সে।

আরমান বলেন—
— “এখন আমি চাই, তোমার মতো সাহসী নারীদের পাশে দাঁড়াই। তোমার প্রতিষ্ঠানে ট্রান্স নারী বা পুরুষদের জন্য আলাদা ট্রেনিং সেল খোলার পরিকল্পনা আছে আমার।”

নাদিয়া বলে—
— “তোমাকে আমি একদিন একবারই বলেছিলাম, ‘তুমি সুন্দর’। আজ আমি সত্যিই গর্বিত—তুমি নিজেই এখন এক অনন্য সৌন্দর্য।”



আরমানের প্রস্তাবে ‘হতভাগা’ একাডেমিতে শুরু হয় ‘রূপান্তরিত মানুষদের জন্য বিশেষ কোর্স’। নাম হয়—"রংধনু শাখা"

তিনজন ট্রান্স নারী এসে ভর্তি হন—
১. শেফালী: যিনি নাচ জানেন, কিন্তু নাচের মাধ্যমে সম্মান পাননি কখনো।
২. মিন্টু: ইলেকট্রিক মিস্ত্রি, কিন্তু লিঙ্গ পরিচয়ের কারণে চাকরি পায়নি।
৩. রোকসানা: যাকে পরিবার বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে।

তাদের নিয়ে শুরু হয় নতুন অধ্যায়। সমাজের চোখে প্রশ্ন, কটূক্তি, ট্রল—সবকিছুকে জয় করার যুদ্ধ।

কিন্তু নতুন ঝড় আসে সেই রাত্রিতে।



রাত্রি দুইটা। অফিসের পেছনের দরজা ভাঙা অবস্থায় পাওয়া যায়।
সিসি টিভিতে দেখা যায়, মুখোশধারী চারজন ভেতরে ঢুকে কাগজপত্র তছনছ করেছে। ট্রান্স অংশগ্রহণকারীদের ডেটা এবং রেজিস্টার চুরি গেছে।

পুলিশ আসে। রায়হান বলেন—
— “এটা সাধারণ চুরি না। তারা আমাদের থামাতে চায়—আমাদের ‘বিপ্লব’কে থামাতে চায়।”

নাদিয়া চিন্তায় পড়ে যায়।
আরমান বলেন—
— “আমি বুঝতে পারছি কে এর পেছনে। দক্ষিণাঞ্চলে একদল ধর্মীয় মৌলবাদী গোষ্ঠী আছে, যারা নারী ও রূপান্তরিত মানুষদের ক্ষমতায়নকে বিরোধিতা করে।”

রায়হান চিন্তিত—
— “তবে কি আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাড়াতে হবে?”

আরমান বলেন—
— “আমরা UN-এর সহায়তায় ডিজিটাল সিকিউরিটি ও নিরাপদ নথি সংরক্ষণ ব্যবস্থা আনব।”



এর মাঝে পায়েল তার সন্তানের জন্ম দেয়। আশ্রয়কেন্দ্রে প্রথমবারের মতো কাঁদে না কেউ—সবাই খুশিতে হাসে।
পায়েল তার সন্তানের নাম রাখে—আলো

নাদিয়া তাকে বলে—
— “এই আলো হবে আমাদের ভবিষ্যৎ। সে জানবে, পাপ তাকে তৈরি করেনি—ভালোবাসাই করেছে।”

সেই সময় শেফালী একটি থিয়েটার গোষ্ঠী তৈরি করে, যেখানে সমাজে বঞ্চিত ট্রান্স ও নারী সদস্যরা মঞ্চনাটক করে। প্রথম নাটকের নাম—“হতভাগা কাহিনী”



আরমানের সাফল্য ও জনপ্রিয়তা দেখে আবার মুখ তোলে রুবিনা।
সে এবার একটি মিডিয়ায় কাজ করছে এবং একটি “এক্সপোজে” তৈরি করে—যেখানে দেখানো হয়, ‘হতভাগা’ কেন্দ্র নাকি LGBTQ+ প্রচারকেন্দ্র।
ভিডিও ভাইরাল হয়। দেশজুড়ে বিতর্ক শুরু হয়।

বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠন এর প্রতিবাদ করে।

রায়হান বলেন—
— “তারা আবার সেই পুরোনো অস্ত্র ব্যবহার করছে—ঘৃণা, অপবাদ, ভয়ের রাজনীতি।”

নাদিয়া বলেন—
— “আমরা কি থামবো?”

আরমান বলেন—
— “না। এই যুদ্ধটা আমাদের পরিচয়ের, মর্যাদার, এবং ভবিষ্যতের। এ যুদ্ধ ভালোবাসার।”



‘হতভাগা’ এবার পাল্টা প্রেস কনফারেন্স করে। সেখানে রায়হান স্পষ্ট ভাষায় বলেন—
— “আমরা কারো ধর্মের বিরুদ্ধে না, আমরা শুধু মানুষের পাশে।
আমরা নারী, পুরুষ, ট্রান্স—সবাই মানুষ হিসেবে থাকতে চাই।
আমাদের অপরাধ শুধু একটাই—আমরা বাঁচতে চাই।”

আরমান বলেন—
— “যারা ভয় দেখায়, তারা জানে না—ভালোবাসা ভয়কে জিতিয়ে দেয়।”

মিন্টু দাঁড়িয়ে বলে—
— “আমি আর কাঁদবো না। আমি মিন্টু—একজন মানুষ। যন্ত্র ঠিক করতেও পারি, হৃদয়ও।”

থিয়েটার দল তাদের প্রথম নাটক নিয়ে বিদেশি ফেস্টিভ্যালে ডাক পায়। এবং ‘হতভাগা’ আন্তর্জাতিক NGO সম্মেলনে পুরস্কার পায় “Inclusive Model of Empowerment” হিসেবে।


চলবে…


পর্ব: ৭
গল্প: হতভাগা
লেখক: গিয়াস_উদ্দিন_আহাম্মদ



গল্প: হতভাগা পর্ব: ৬ লেখক: গিয়াস_উদ্দিন_আহাম্মদ

 



গল্প: হতভাগা
পর্ব: ৬
লেখক: গিয়াস_উদ্দিন_আহাম্মদ



রাত দশটা। 'হতভাগা' আশ্রয়কেন্দ্রের অফিসঘরে বসে নাদিয়া আগের দিনের কাগজপত্র মিলিয়ে দেখছে। হঠাৎ করেই বাইরে এক নারীর কান্নার শব্দ ভেসে এলো। নাদিয়া দেরি না করে ছুটে গেল মূল ফটকের দিকে।

সেখানে দাঁড়িয়ে আছে এক মেয়ে—বয়স সতেরো কি আঠারো। গায়ে রক্ত, চোখ ভয়ে ভরা। কোলে একটা ছোট্ট পুঁটলি। নাদিয়া তার হাত ধরে ভিতরে নিয়ে এলো।

— "তুমি নাম বলো মা, ভয় পেও না। আমরা তোমার পাশে আছি।"

মেয়েটি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বলে—
— "আমি পায়েল... বিয়ের নাম করে এক লোক আমাকে নিয়ে গিয়েছিলো। পরে বিক্রি করে দেয় এক দালালের হাতে। আমি পালিয়ে এসেছি। পেটের এই বাচ্চাটা সেই পাপের ফল।"

নাদিয়া নিঃশ্বাস টেনে বলে—
— "এই ঘরটা কোনো পাপ দেখে না, শুধু দেখে সাহস। তুমি এখন থেকে নিরাপদ।"

কিন্তু পায়েলের আগমনের পর থেকেই আশ্রয়কেন্দ্রকে নিয়ে বাইরের সমাজে আবার প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভুয়া পোস্ট, নিউজপোর্টালে শিরোনাম—
“হতভাগা: নারী আশ্রয়ের আড়ালে কি অন্য ব্যবসা?”


এমতাবস্থায় একদিন প্রশাসনের একটি দল আসে তদন্তে। থানার এক পুলিশ অফিসার, সমাজসেবা অধিদপ্তরের দুজন কর্মী এবং সাংবাদিকের দলসহ এক বিশাল তদারকি।

তদন্ত শুরু হয় পায়েলকে ঘিরে। কেউ কেউ জিজ্ঞাসা করে,
— “তুমি কি নিশ্চিত এই আশ্রয়কেন্দ্র নিরাপদ?”

পায়েল মাথা নিচু করে বলে,
— “আপনারা যদি ওনাদের এখানে না আনতেন, আমি হয়তো আজ কাঁদতেই পারতাম না। আমার কান্নারও জায়গা নেই ছিলো। এখানে আমি আছি, শুধু তা-ই না—বাঁচছি।”

রায়হান সোজা দাঁড়িয়ে বলে—
— “আপনারা প্রশ্ন করেন আমাদের বিরুদ্ধে? দোষ আমাদের না, সমাজের, যে পায়েলের মতো মেয়েদের ভয় দেখায়, আর সাহসীদের সন্দেহ করে।”

এক সাংবাদিক তীব্র প্রশ্ন ছোড়ে,
— “আপনার স্ত্রী নাদিয়া নিজেও তো একটি বিতর্কিত চরিত্র। একজন ‘অবৈধ’ সন্তানসম্ভবা নারী হিসেবে সমাজ আপনাকে ক্ষমা করেনি। আপনি কীভাবে তাকে সংগঠনের মুখ বানালেন?”

নাদিয়া তখন ধীর কণ্ঠে বলে—
— “যে সমাজ অবৈধ শব্দ দিয়ে একজন নারীর চরিত্র বিচার করে, তারা কি কখনো পুরুষের চরিত্র প্রশ্ন করে? আমার সন্তান অবৈধ না—অবহেলিত সমাজে জন্ম নিয়েছে, তবু সে সম্মানের দাবিদার।”

এমন সাহসী জবাবে পুরো ঘরে স্তব্ধতা। একজন মহিলা সমাজকর্মী ধীরে ধীরে হাততালি দেয়। তারপর সবার মুখে সেই তালি ছড়িয়ে পড়ে।



এরই মাঝে রুবিনা—সেই পুরোনো প্রতিবেশী, যে একসময় নাদিয়াকে নোংরা অপবাদ দিয়েছিলো, হঠাৎ এসে ক্ষমা চায়।

— “ভাবি, আমি একটা ভুল করেছিলাম। আমার বলা কথায় তোমার জীবনে অনেক বিপদ হয়েছিলো। এখন বুঝি, তুমি যা করেছো, অনেক মেয়ে তা করতে পারে না।”

নাদিয়া কোনো উত্তর না দিয়ে চুপ করে থাকে।

কিন্তু পরে দেখা যায়, রুবিনা এখন একটি নতুন NGO-র হয়ে কাজ করছে, যারা 'হতভাগা' কেন্দ্র বন্ধ করার জন্য তৎপর। তার ক্ষমা ছিল এক নাটক, একটি ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের অংশ।

একদিন রাতে অফিস থেকে ফেরার সময় নাদিয়া দেখতে পায়—আশ্রয়কেন্দ্রের দেয়ালে স্প্রে করে লেখা:
“নাদিয়া = চরিত্রহীন। হতভাগা = পাপের কারখানা।”

রায়হান ফুঁসে ওঠে।
— “এদের থামাতে হবে। আইনিভাবে, সামাজিকভাবে।”

নাদিয়া মাথা ঠান্ডা রেখে বলে—
— “তারা আমাদের টানতে চায় আবর্জনার মধ্যে। আমরা বরং আলো জ্বালাই, যাতে ওদের অন্ধকার আরও স্পষ্ট হয়।”



রায়হান সিদ্ধান্ত নেয়—রুবিনার বিরুদ্ধে কোর্টে মানহানির মামলা করবে। প্রমাণ আছে—ভিডিও, কলরেকর্ড, ফেসবুক পোস্ট।

কিন্তু ঠিক সেই সময় নাদিয়া রায়হানকে থামে—

— “তুমি প্রতিশোধ নিতে চাও, নাকি ন্যায় বিচার চাও?”

রায়হান জবাব দেয়—
— “আমি চাই, যারা আমাদের বন্ধ করতে চায়, তারা বুঝুক—সত্যি কখনো থামে না।”

নাদিয়া তখন বলে—
— “তাহলে প্রতিশোধ নয়, পথ দেখাও। আমরা মিডিয়াতে একটা ওপেন প্রেস কনফারেন্স করি। সমস্ত মেয়ে যারা এখান থেকে নতুন জীবন পেয়েছে, তাদের সামনে আনো। সত্যিটা ওরাই বলবে।”

এবং হয় ঠিক তাই। দিন নির্ধারিত হয়—“হতভাগা সত্য সম্মেলন”



একটি অডিটোরিয়ামে বড় করে ব্যানার টানানো হয়েছে—
“আমরা কলঙ্ক নই—আমরা বেঁচে থাকার গল্প”

প্রথম বক্তা সীমা—
— “আমার স্বামী আমার চোখের সামনে আমার মেয়েকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। সেদিন আমি মরতাম। কিন্তু নাদিয়া আপা আমাকে বলেছিলো, ‘তুমি মরলে ওরা জিতবে’। আজ আমি একটি নার্সিং ট্রেনিং কোর্স শেষ করেছি।”

পরের বক্তা পায়েল—
— “আমি শুধু নিজের সন্তানের জন্যই না, সেই মেয়েদের জন্যও বাঁচতে চাই যারা আজও কাঁদে। ভাবি আমাকে নাম দিয়েছেন ‘আলো পায়েল’। আমি এখন আঁধারকে ভয় পাই না।”

মঞ্চে ওঠে নাদিয়া। তার কণ্ঠে কোনো রাগ নেই, শুধু দৃঢ়তা—
— “আজ যারা আমাদের প্রশ্ন করছে, তাদের জবাব দিয়েছে এই মেয়েগুলো। যারা একদিন সত্যিই ‘হতভাগা’ ছিল, আজ তারা সমাজের সবচেয়ে সৌভাগ্যবান মানুষ—কারণ তারা বেঁচে আছে, মাথা উঁচু করে।”



তদন্তের পর আদালতের নির্দেশে রুবিনার NGO-র কার্যক্রম স্থগিত হয় এবং তার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা চলে। সব প্রমাণ দেখে রায়হান শেষমেশ মামলা তুলে নেয়।

নাদিয়া বলে—
— “আমরা দেখালাম, ক্ষমা করা মানেই দুর্বলতা নয়। সেটাই আমাদের শক্তি।”

ঠিক তখনি ফোন আসে—শাহিনুর বেগম মারা গেছেন।

নিরবতা ছায়ার মতো ঘর জুড়ে বসে পড়ে। রায়হান চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে, চোখ দিয়ে টুপটুপ করে জল পড়ে।

— “আমি তো ভাবতাম, একদিন ওনার কোলেই মাথা রাখব… আর সে দিনটা আসার আগেই সব শেষ।”

নাদিয়া তার হাত ধরে বলে—
— “তুমি তার সন্তান। যত ক্ষোভই থাক, মা কখনো শেষ হয় না। আর তুমি তো তার জন্যই লড়ছিলে… সেটা জানলে তিনি শান্তি পাবেন।”



মায়ের কবর থেকে ফিরে রায়হান আর নাদিয়া সিদ্ধান্ত নেয়—'হতভাগা' এখন শুধু আশ্রয়কেন্দ্র নয়, এটি হবে একটি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট

নতুন প্রজেক্টের নাম হয়—“হতভাগা স্কিল একাডেমি”
যেখানে নারী ও শিশুদের জন্য থাকবে কম্পিউটার ট্রেনিং, হস্তশিল্প, সেলাই, নার্সিংসহ আরও নানা কোর্স।

উদ্বোধনের দিন রায়হান বলে—
— “আমরা হয়তো সমাজকে বদলাতে পারি না পুরোপুরি। কিন্তু অন্তত কিছু জীবন বদলে দিতে পারি। আর সেটাই আমাদের সার্থকতা।”


চলবে…
পর্ব: ৬
গল্প: হতভাগা
লেখক: গিয়াস_উদ্দিন_আহাম্মদ


📗প্রিয় পাঠক পাঠিকরা হতভাগা গল্পটি সম্পন্ন pdf📄 নিতে চান তাহলে এ নাম্বার 01897682335 হোয়াটসঅ্যাপ বা ইমু করুন নাহলে পেইজে ইনবক্স করুন।



💝প্রিয় পাঠক, আপনার জন্য একটি ক্ষুদ্র অনুরোধ!


আপনি যখন আমার গল্পটি পড়ছেন, তখন শুধু একটি গল্পই নয়—আমার স্বপ্নকেও সমর্থন করছেন। গল্পের শেষে থাকা **মাত্র ৫ সেকেন্ডের বিজ্ঞাপনটি** ক্লিক করলে আমার সামান্য আয় হয়। ফেসবুক বা ওয়েবসাইট সরাসরি আয় দেয় না, কিন্তু **আপনার একটি ক্লিক** আমাকে নিয়মিত গল্প লিখতে অনুপ্রাণিত করে!  


এই ছোট্ট সহযোগিতাটুকুই আমার জন্য বিশাল। আপনার ভালোবাসা আর সমর্থন পেলে আমি আরও মন দিয়ে গল্প লিখতে পারব। ❤️  


**🔗 বিজ্ঞাপন লিঙ্ক:** 👇

https//wwwaddsadstaraadda.com


**#আপনার_এক_ক্লিক_আমার_অনুপ্রেরণা**  



✨ **ধন্যবাদ** আমার গল্পের পাশে থাকার জন্য!  





৪থ পর্ব লিংক👇

 https//mgugoloplikestorehotobagapartth




হতভাগা পর্ব ৫: লেখক: গিয়াস_উদ্দিন_আহাম্মদ

 



হতভাগা

পর্ব ৫: অজানা পথের যাত্রী

লেখক: গিয়াস_উদ্দিন_আহাম্মদ

বৃষ্টির শব্দে ঘুম ভেঙে যায় নদিয়ার। জানালার কাঁচে টুপটাপ শব্দ তুলে বৃষ্টি পড়ছে। পাশেই ছোট্ট বালিশে ঘুমিয়ে আছে ওর ছেলেটা, নাম রেখেছে নিলয়। সাত মাস বয়স, চোখে-মুখে বাবার ছায়া, অথচ সেই বাবাই কোথায় আজ, নদিয়া জানে না। নিলয়ের মুখের দিকে তাকালে নদিয়ার মনে হয়, এই ছোট্ট মুখটাই যেন তার অস্তিত্ব। সে যেন আর নিজেকে নিয়ে ভাবে না, ভাবে শুধু নিলয়কে নিয়ে।

নদিয়া এখন একটি মেসে থাকে—রামপুরার গলির মধ্যে, পাঁচজন মেয়ের সঙ্গে ভাগাভাগি করে একটা ছোট ঘর। ঘর বলতে চারদিকে ইটের দেয়াল, একটা জানালা, আর একটা বাথরুম। ঘর ভাড়া দেয় এক অবিবাহিত মহিলা, নাম পারভীন, বয়স পঁচিশ ছুঁই ছুঁই। ও-ও একসময়ে পরিবার ছেড়ে এসেছিল, স্বপ্ন ছিল বড় হওয়ার, কিন্তু সেই স্বপ্ন ধুলায় মিশে গেছে।

নদিয়া চাকরি নেয়েছে একটা বুটিক হাউজে—বাগিচা ফ্যাশন নামে এক দোকান। মিরপুর রোডে অবস্থিত, ওখানে সে কাপড় ভাঁজ করে, কখনও কাস্টমার সামলায়, আবার কখনও ঝাড়ু দেয়। সকাল ৯টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত কাজ, বেতন মাত্র আট হাজার টাকা। কিন্তু এই টাকায়ই চলে ওর ও নিলয়ের খরচ। মাঝে মাঝে পারভীন বা পাশের মেয়েরা সাহায্য করে। তবে নদিয়া কারও কাছে হাত পাততে চায় না, চেয়েও না।

সন্ধ্যা নামলে নদিয়া এক কোণে বসে কাপড় সেলাই করে। ওর মা ছোটবেলায় তাকে সুই-সুতো ধরতে শিখিয়েছিল। সেই হাতের কাজই এখন ওর সবচেয়ে বড় ভরসা। কয়েকটা নিয়মিত কাস্টমার পেয়েছে সে—কারও ব্লাউজ ফিটিং, কারও সালোয়ারের পাড় লাগানো, তো কারও আবার নতুন কুর্তি বানানো। এই বাড়তি ইনকামে মাসের শেষে একটু হাঁফ ছেড়ে বাঁচে।

একদিন দোকানে হঠাৎ এক নতুন ক্রেতা আসে—মাঝবয়সী, সুপরিচিত চেহারা, কাঁধে ঝোলা ব্যাগ। সে জিজ্ঞেস করে, “আপনার নাম নদিয়া না?” নদিয়ার বুক ধক করে ওঠে। “আপনি কে?” সে ভয়ে জিজ্ঞেস করে।

লোকটা হেসে বলে, “আমি রায়হান। একটা এনজিও-তে কাজ করি, শহরের আশ্রয়হীন মা ও শিশুদের নিয়ে।”

নদিয়া কেমন যেন বিব্রত হয়। “আপনি কীভাবে চিনলেন আমাকে?”

“আমার সহকর্মী একদিন এই দোকান থেকে কিছু কিনেছিল, তোমার কথাও বলেছিল। আমি শুধু জানতে চেয়েছিলাম—তুমি কেমন আছো।"

রায়হান বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে কথা বলে, তারপর একদিন মেস পর্যন্ত আসে। পারভীনের সঙ্গে কথা বলে, তারপর নিলয়ের সঙ্গেও খেলে। নদিয়া বিস্মিত হয় এই মানুষটার আন্তরিকতায়।

তারপর একদিন রায়হান প্রস্তাব দেয়, “তুমি চাইলে আমাদের এনজিও-তে শিশুদের জন্য একটি ডে-কেয়ার সুবিধা পাবে। তুমি সকালবেলা নিলয়কে দিয়ে এসে কাজ করতে পারো। ওখানে ওর খাওয়া-দাওয়া, ঘুমানো সব ব্যবস্থাই থাকবে।”

নদিয়ার চোখে জল আসে। এতদিন নিলয়কে ঘরে রেখে কাজে যাওয়া, মাঝে মাঝে অসুস্থ হলে মেসের মেয়েরা দেখত, কিন্তু মন তো পড়ে থাকত ছেলেটার দিকেই। এখন যদি একটু নিশ্চিন্তে কাজ করতে পারে!

নদিয়া রাজি হয়। পরদিনই রায়হান তাকে নিয়ে যায় সেগুনবাগিচায় ‘আলোকধারা’ নামের সেই এনজিও-তে। পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, দায়িত্বশীল কর্মী, খেলার সামগ্রী—সব দেখে নদিয়ার মন ভরে যায়।

সেই থেকেই নদিয়ার জীবনে ধীরে ধীরে বদল আসে। সে নিয়মিত কাজ করে, সন্ধ্যায় ফিরে নিলয়কে নিয়ে গল্প করে, ছুটি পেলে মাঠে নিয়ে যায়। নিলয়ও ওর হাসি দিয়ে পৃথিবীটা বদলে দিতে পারে যেন।

কিন্তু সমাজ কি থেমে থাকে?

একদিন মিরপুর রোডের দোকানে এক পুরোনো পরিচিত এসে দাঁড়ায়—নদিয়ার খালাতো ভাই। “তুই এখানে?” তার গলায় বিষ। “মায়ের মুখ ডুবিয়েছিস, বাচ্চা নিয়ে দোকানে কাজ করিস? নাম না করলি ভালো, শোন!”

নদিয়া একটুও থামে না। সে মাথা উঁচু করে বলে, “আমার কাজের গরিমা আছে। আমি চুরি করি না, ভিক্ষা করি না। বাচ্চা নিয়ে বাঁচার চেষ্টা করছি।”

লোকটা আর কিছু না বলে চলে যায়। কিন্তু তার কথা কাঁটার মতো বিঁধে থাকে নদিয়ার মনে।

রায়হান একদিন নদিয়ার হাতে একটি কাগজ দেয়। “আমরা কিছু মায়েদের নিয়ে একটা আত্মজীবনীমূলক বই প্রকাশ করছি। তুমি চাইলে তোমার জীবনের গল্পটা লিখে দাও। অনেকে তোমার মতো সাহস খুঁজে পাবে।”

নদিয়া ভয় পায়। নিজের দুঃখের কাহিনি কে জানবে? কে পড়ে দেখবে? কিন্তু আবার ভাবে—যদি একজন নারীও পড়ে অনুপ্রাণিত হয়, তাহলেই বা ক্ষতি কী?

সে লিখতে শুরু করে। প্রতিরাতে কিছু করে লিখে, এক মাস পরে দেয় রায়হানের হাতে। রায়হান পড়ে শেষ করে বলে, “তুমি জানো না, তোমার ভেতরে কী শক্তি আছে নদিয়া।”

বইটি প্রকাশিত হয়—“হতভাগা থেকে যোদ্ধা” নামে।

সাংবাদিকেরা খোঁজ নেয়, সাক্ষাৎকার নেয়। নদিয়ার নাম উঠে আসে কাগজে, ম্যাগাজিনে।
একদিন এক টিভি চ্যানেল থেকে ফোন আসে—“আপনাকে নিয়ে একটি অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানাতে চাই।”

নদিয়া চমকে যায়। সে কি পারবে? সে কি ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে পারবে?

রায়হান তখন পাশে দাঁড়িয়ে বলে, “তুমি তো প্রতিদিন সাহস দেখাও, এইটুকু তো তুচ্ছ।”

নদিয়া যায়। অনুষ্ঠান হয়। দর্শকেরা উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দেয়। সেই হাততালির শব্দে হারিয়ে যায় আগের সব অপমান, লজ্জা, দুঃখ।

তবে, সুখ কখনও চিরস্থায়ী হয় না।

এক সন্ধ্যায়, যখন নদিয়া নিলয়কে কোলে নিয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ট্যাক্সির জন্য অপেক্ষা করছিল, একটা সাদা গাড়ি এসে দাঁড়ায়। জানালার কাঁচ নেমে যায়।

সেখানে এক পরিচিত মুখ—নিলয়ের বাবা!

চোখে চশমা, মুখে একটু বয়সের ছাপ, কিন্তু নদিয়ার মনে পড়ে সেই রাতের কথা, সেই প্রতিশ্রুতি, সেই ফেলে যাওয়া ভোর।

লোকটি শুধু একটুকু বলে, “নদিয়া, আমাকে একটু সময় দাও... আমি সব কিছু বোঝাতে চাই।”

নদিয়া নিশ্চুপ। কোলে ঘুমন্ত নিলয়ের মুখের দিকে চেয়ে থাকে সে। পুরোনো ক্ষত যেন হঠাৎ আবার ফেটে গেল।


(চলবে...)

💝হতভাগা গল্পটি সম্পন্ন pdf নিতে চান তাহলে এ নাম্বার 01897682335 হোয়াটসঅ্যাপ বা ইমু করুন নাহলে পেইজে ইনবক্স করুন।

⭕শত্য প্রযোজ্য।


💝প্রিয় পাঠক, আপনার জন্য একটি ক্ষুদ্র অনুরোধ!


আপনি যখন আমার গল্পটি পড়ছেন, তখন শুধু একটি গল্পই নয়—আমার স্বপ্নকেও সমর্থন করছেন। গল্পের শেষে থাকা **মাত্র ৫ সেকেন্ডের বিজ্ঞাপনটি** ক্লিক করলে আমার সামান্য আয় হয়। ফেসবুক বা ওয়েবসাইট সরাসরি আয় দেয় না, কিন্তু **আপনার একটি ক্লিক** আমাকে নিয়মিত গল্প লিখতে অনুপ্রাণিত করে!  


এই ছোট্ট সহযোগিতাটুকুই আমার জন্য বিশাল। আপনার ভালোবাসা আর সমর্থন পেলে আমি আরও মন দিয়ে গল্প লিখতে পারব। ❤️  


**🔗 বিজ্ঞাপন লিঙ্ক:** 👇

https//wwwaddsadstaraadda.com


**#আপনার_এক_ক্লিক_আমার_অনুপ্রেরণা**  



✨ **ধন্যবাদ** আমার গল্পের পাশে থাকার জন্য!  





৪থ পর্ব লিংক👇

 https//mgugoloplikestorehotobagapartth




পর্ব: ৫ গল্প: হতভাগা লেখক: গিয়াস_উদ্দিন_আহাম্মদ

 



গল্প: হতভাগা
পর্ব: ৫
লেখক: গিয়াস_উদ্দিন_আহাম্মদ

রায়হান আর নাদিয়ার জীবনে এক নতুন সকাল। 'হতভাগা' নামের যে সংগঠনের স্বপ্ন তারা বুনেছিল, তা আজ বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। শহরের উপকণ্ঠে একটি পুরনো বাড়ি সংস্কার করে চালু হচ্ছে সেই আশ্রয়কেন্দ্র—সেই আশ্রয়, যেখানে মেয়েরা নির্যাতনের ইতিহাস নয়, নিজের ভবিষ্যৎ গড়বে।

নাম—“হতভাগা আশ্রয়ণ কেন্দ্র”



সকাল ৯টা। ঘরের প্রতিটি কোণে ব্যস্ততা। রায়হান অফিস থেকে কিছু কর্মী নিয়ে এসেছে, যারা অফিসিয়াল ফাইল তৈরির কাজ করছে। নাদিয়া প্রতিটি ঘর ঘুরে দেখছে—শিশুদের ঘর, কাউন্সেলিং রুম, রান্নাঘর সবকিছু ঠিকঠাক হচ্ছে কি না।

একটা ছোট ঘরে তিনটি খাট বসানো হয়েছে। বালিশের পাশে রাখা কিছু বই। দেয়ালে লেখা—


এই লাইনটা নাদিয়া নিজেই লিখেছে।

তখনই একজন নারী আসেন দরজায়। বয়স ত্রিশের কাছাকাছি। মুখে চাপা কান্নার ছাপ। কোলে ছোট্ট এক মেয়ে।

— “আপারা, আমার নাম সীমা। আমি পালিয়ে এসেছি আমার স্বামীর হাত থেকে। আমাকে কি একটু থাকতে দেবেন এখানে?”

নাদিয়া হাসিমুখে বলে,
— “আপনার বাড়ি এখন এইখানেই। আর কখনো আপনাকে পালাতে হবে না।”

সীমা চোখ মুছে বলে,
— “আপার গল্পটা পত্রিকায় পড়েছিলাম। তখনই ঠিক করেছিলাম, যদি কোনোদিন বাঁচতে চাই, তাহলে আপনাদের কাছেই আসব।”

নাদিয়া ওর হাত ধরে বলে,
— “আপনার বাঁচা আজই শুরু হলো।”



এই সময়ে একদিন হঠাৎ খবর আসে—শাহিনুর বেগম গুরুতর অসুস্থ। স্ট্রোক হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি।

রায়হান খবর শুনে স্থির হয়ে যায়।

তিন বছর হয়ে গেল—মা আর ছেলে কথা বলেনি। নাদিয়ার প্রসঙ্গে যে কঠিন কথা বলা হয়েছিল, সেটা এখনো রায়হানের বুকে শেকড় গেড়ে আছে। কিন্তু রক্তের সম্পর্ক কি চাইলেই মুছে ফেলা যায়?

নাদিয়া বলে,
— “তোমার উচিত, মায়ের পাশে যাওয়া।”

রায়হান বিষণ্ণ কণ্ঠে বলে,
— “সে মা আমার স্ত্রীকে কলঙ্কিনী বলেছিল।”
— “হয়তো এখন তার বুকেও তীব্র অনুশোচনা আছে। এখন সময় সম্পর্ক জোড়ার, ছিঁড়বার নয়।”

রায়হান চুপচাপ চলে যায় হাসপাতালে। কেবিনে ঢুকে দেখে, বৃদ্ধা মা চোখ বুজে শুয়ে আছেন। চোখের কোণ ভেজা। ডাক্তার বলে দিয়েছেন—চাপ খুব কম, যেকোনো সময় খারাপ কিছু হতে পারে।

রায়হান ধীরে ধীরে মায়ের পাশে বসে। হাতটা ধরে।
— “মা, আমি এসেছি।”

শাহিনুর বেগম চোখ মেলে তাকায়। কান্না জড়ানো গলায় ফিসফিস করে বলেন,
— “বাবা, আমি ভুল করেছি। আমি মানুষ চিনতে ভুল করেছি। তোদের দূরে ঠেলে দিয়েছিলাম। কিন্তু আমি তোর বউকে কখনো ভুলতে পারিনি... প্রতিদিন আল্লাহর কাছে মাফ চাই।”
— “মা, আল্লাহ চাইলে সব মাফ হয়। তুমি শুধু বাঁচো। আমরা আবার একসাথে থাকব।”

এই প্রথম বার রায়হান নিজের চোখে পানি দেখে। সেই মা, যে কঠোর ছিলেন, আজ এক গুচ্ছ অনুশোচনায় নরম হয়ে গেছেন।



‘হতভাগা আশ্রয়ণ কেন্দ্র’ দিনে দিনে একটি আলোচিত প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম কাভার করে। এনজিও, সরকারি প্রতিষ্ঠানও সাহায্যের হাত বাড়ায়।

কিন্তু, নতুন আলো যতই জ্বলে, পুরনো অন্ধকার ততই ছায়া ফেলে।

একদিন খবর আসে—সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একাধিক মিথ্যে গল্প ছড়ানো হচ্ছে। কেউ বলছে, “নাদিয়া নিজের খ্যাতি আর টাকা কামানোর জন্য এসব করছে।”
কেউ বলছে, “ওর চরিত্র এখনো সন্দেহজনক, ওর বাচ্চার আসল বাপ কে তা আজও কেউ জানে না।”

নাদিয়া সব শুনেও চুপ থাকে। কিন্তু সীমা এসে একদিন বলে,
— “আপা, আমি সব সহ্য করতে পারি, কিন্তু আপনার বিরুদ্ধে কেউ কিছু বললে সহ্য হয় না।”

নাদিয়া বলে,
— “তাদের কথা শোনার দরকার নেই। তারা কোনোদিন আমাদের জায়গায় ছিল না, থাকবে না।”

রায়হান পাশে এসে বলে,
— “জানো, তুমি যত ওপরে উঠছো, ততই নিচু লোকদের আওয়াজ বাড়বে।”

নাদিয়া মাথা নিচু করে বলে,
— “আমার শুধু ভয় হয়, আমার ছেলে একদিন এই কথাগুলো শুনে কি ভাববে?”

রায়হান ওর কাঁধে হাত রেখে বলে,
— “সে গর্ব করবে, মা হিসেবে একজন যোদ্ধা পেয়েছে বলে।”



‘হতভাগা’ সংগঠন একদিন আয়োজন করে একটি বড় অনুষ্ঠান—“সাহসিনী উৎসব”। যেসব নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে লড়েছেন, তাদের সম্মাননা দেওয়া হবে।

অনুষ্ঠানের শেষ বক্তা নাদিয়া। স্টেজে উঠে চুপ করে দাঁড়ায়। পুরো মিলনায়তন স্তব্ধ। কেউ কেউ মোবাইল দিয়ে ভিডিও করে, কেউ চোখ মুছে।

নাদিয়া বলে—

“আমি একদিন গর্ভবতী হয়েছিলাম, যখন সমাজ বলেছিল, এই সন্তান পাপের ফল।
আমি ঘরে ফিরিনি, রাস্তায় ফিরিনি—আমি নিজের অস্তিত্বে ফিরেছি।

আমার সন্তান আজ স্কুলে যায়। হাসে, দৌড়ায়। তাকে দেখে কেউ বলে না, সে ‘পাপের ফল’।
কারণ সে আমার মতো একটি মেয়েকে নতুন জীবন দিয়েছে।

আমি চাই, এই পৃথিবীতে আর কোনো মেয়েকে ‘হতভাগা’ না শুনতে হয়।
তাকে বলা হোক—‘তুমি একা নও।’”

সবাই উঠে দাঁড়িয়ে তালি দেয়। সেদিন ‘হতভাগা’ নামটা আর একটি অপবাদ নয়, সেটি এক উৎসাহের প্রতীক



ঠিক যখন সব কিছু গুছিয়ে আসছিল, একদিন সীমা চিৎকার করে ছোটে—
— “আপা! তানিয়ার খবর পেয়েছি। ওকে ওর স্বামী খুন করে ফেলেছে!”

তানিয়া ছিল ‘হতভাগা’ কেন্দ্রে প্রথম দিককার বাসিন্দা। সে নিজের সন্তানকে নিয়ে পালিয়ে এসেছিল। পরে নিজেই গ্রামের বাড়ি ফিরে গিয়েছিল, সমাজের চাপে।

নাদিয়া খবর শুনে বসে পড়েন মাটিতে।

— “আমি ওকে রক্ষা করতে পারিনি… আমি ব্যর্থ...”

রায়হান পাশে বসে বলে,
— “তুমি একা নও। আমাদের লড়াইটা এখনো অনেক বাকি। আমাদের আর একটা তানিয়াকে হারাতে দেওয়া চলবে না।”



একদিন সকালে, রায়হান নাদিয়াকে বলে,
— “তোমার জীবনের গল্পটা একটা সিনেমা বানাতে চাই এক পরিচালক। রাজি হবে?”

নাদিয়া চুপ করে। বলে,
— “গল্পটা আমার না। এটা হাজার হাজার মেয়ের। যদি ওদের কণ্ঠ হয়, তাহলে হ্যাঁ।”

ফেব্রুয়ারি মাসে ‘হতভাগা’ নামে সিনেমা মুক্তি পায়। প্রচুর দর্শক দেখে, ভালোবাসে।

নাদিয়ার ছেলে তখন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। একদিন স্কুল থেকে ফিরে বলে,
— “মা, সবাই বলে তুমি হিরো... তুমি কি হিরো?”

নাদিয়া হেসে বলে,
— “আমি মা, আর তুই আমার হিরো।”

ছেলেটা বলে,
— “তাহলে আমি একদিন তোমার মতো হবো।”



হতভাগা নামের মেয়েটি এখন শতভাগ সাহসের প্রতীক। তার গল্পের শুরু যেখানে “পাপ” বলে ডাকা হয়েছিল, সেইখান থেকেই সে প্রমাণ করেছে—“পাপ নয়, সে প্রত্যাঘাত।”


চলবে…
পর্ব: ৫
গল্প: হতভাগা
লেখক: গিয়াস_উদ্দিন_আহাম্মদ



গল্প: হতভাগা পর্ব: ৪ লেখক: গিয়াস_উদ্দিন_আহাম্মদ

 





 

গল্প: হতভাগা

পর্ব: ৪

লেখক: গিয়াস_উদ্দিন_আহাম্মদ


ঘড়ির কাঁটা তখন দুপুর বারোটা পেরিয়ে গেছে। আদালতের রায় ঘোষণার পর কেটে গেছে প্রায় তিন মাস। তিনজন অপরাধী এখন কারাগারে। সমাজের চোখে নাদিয়া এখন এক ‘বীর নারী’। কিন্তু নিজের মনে? প্রতিদিন সকালেই প্রশ্ন করে সে নিজেকে—"আমি কি আসলেই ঠিক আছি?"


ছোট্ট ছেলেটাকে কোলে নিয়ে সে বারান্দায় বসে। কোকিলের ডাক শোনে। হালকা বাতাসে শাড়ির আঁচল দুলে ওঠে। একটুকরো শান্তি, কিন্তু অস্থির এক হৃদয়ের মাঝে।


রায়হান সেই সকালে অফিস গেছে। এখন সে একটি এনজিওতে কাজ করে, যেখানে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে কাজ হয়। নাদিয়া নিজেও মাঝে মাঝে অংশ নেয় তাদের প্রজেক্টে।


ঠিক তখনই ফোনটা বেজে ওঠে। অপরিচিত নম্বর।


— “হ্যালো, আপনি কি নাদিয়া আক্তার বলছেন?”

— “জি, আমি নাদিয়া।”

— “আমি সাংবাদিক রফিকুল ইসলাম, দৈনিক যুগধ্বনি থেকে বলছি। আমরা আপনার জীবনের গল্পটা নিয়ে একটি কভার স্টোরি করতে চাই। আপনি কি রাজি হবেন?”


নাদিয়ার চোখ স্থির হয়ে আসে। সে চায় না তার সন্তান আর তার নাম একসাথে খবরে উঠুক। কিন্তু আবার ভাবে—"যদি আমার গল্প আরও একজন মেয়েকে সাহস দেয়?"


— “আমি সময় নিয়ে আপনাকে জানাবো, ভাই। একটু ভাবতে দিন।”

— “অবশ্যই, আপা। আমরা অপেক্ষা করব।”


ফোনটা রেখে ছেলের কপালে একটা চুমু খায় নাদিয়া।

— “তুইই আমার শক্তি, বাবু।”


---


একদিন বিকেলে রায়হান বাড়ি ফিরে দেখে নাদিয়া অদ্ভুত চুপচাপ।

— “কি হয়েছে তোমার?”

— “তুমি কি চাও সবাই জানুক আমি কীভাবে মা হয়েছি?”

— “আমার চাইতে বড় কথা হলো, তুমি কী চাও?”


নাদিয়া জানালার দিকে তাকিয়ে বলে,

— “আমি চাই, আমার কষ্ট কারও উপহাস না হোক। কিন্তু যদি আমার কষ্ট আর কাউকে সাহস দেয়, তবে হ্যাঁ… আমি চাই, জানুক সবাই।”


রায়হান ওর হাত ধরে,

— “তাহলে রাজি হয়ে যাও। আমি পাশে আছি সবসময়।”


---


দৈনিক যুগধ্বনির প্রথম পাতায় নাদিয়ার মুখ—বড় করে লেখা “একজন নাদিয়ার গল্প”। নিচে সাবহেডলাইন:

**“ধর্ষণের শিকার, কিন্তু ভেঙে না পড়ে লড়েছেন, বিচার ছিনিয়ে এনেছেন। সমাজের কলঙ্ক নয়, তিনি আজ প্রেরণা।”**


সেই দিন থেকে বদলে যেতে থাকে অনেক কিছু। নারীরা ফেসবুকে শেয়ার করে আর বলে,

— “আমরা সবাই নাদিয়া।”


গ্রামের কলেজের ছাত্রী রূপা এসে বলে,

— “আপা, আপনি আমার হিরো। আমি আপনাকে দেখে সাহস পাই।”

— “তুমি নিজের ভেতরে সেই সাহস খুঁজে নাও, রূপা। আমার গল্প শুধু একটা উদাহরণ।”


তবে এর মাঝে কিছু বিষাক্ত কথাও শোনা যায়—

— “এই মেয়েটার কি লজ্জা নেই?”

— “সব সময় মিডিয়ায় নিজেকে দেখায়।”

— “এ তো নাম কামানোর একটা পদ্ধতি পেয়েছে।”


রায়হান এসব শুনে রাগ হয়, কিন্তু নাদিয়া শুধু একবার হাসে।

— “তারা বোঝে না। তাদের বোঝার চোখ নেই।”


---


দিন যায়, সপ্তাহ গড়ায়। নাদিয়ার ছেলে এখন হাঁটতে শেখে, "মা মা" বলে ডাকে।


একদিন হঠাৎ করেই রায়হানের বাবার বড় ভাই, মানে গ্রামের প্রভাবশালী লোক—মজিবর চাচা আসেন বাড়িতে।


— “রায়হান, আমি ভাবছি, তোমাদের শহরে একটা বাসা নিয়ে দেই। এখানে তোমাদের নিয়ে অনেক কথা হয়। এই ছেলে তো তোমার নয়, সবাই জানে। কেন এসব সয়ে যাচ্ছ?”


রায়হান চুপ। মাথা নিচু করে বসে থাকে।


নাদিয়া এগিয়ে আসে। চোখে পানি নেই, কিন্তু কণ্ঠটা কঠিন।


— “চাচা, আপনি চাইলে বাসা কিনে দিতে পারেন। কিন্তু আমি কোথায় থাকব, সেটা আপনি ঠিক করবেন না। আর একটা কথা মনে রাখবেন, এই ছেলে শুধু আমার নয়, রায়হানেরও।”


চাচা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন। রায়হান এবার বলে,

— “চাচা, সন্তান রক্তের না হোক, ভালোবাসার তো হয়। আমি এই ছেলেকে বাবা হিসেবেই বড় করব। সে আমার গর্ব।”


মজিবর চাচা যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারেন না। তিনি উঠে বলেন,

— “আজকাল মেয়েদের মুখের জোর বেড়েছে। ভালোই। তবে সময়ই সব ঠিক করবে।”

চলে যান, আর ফেরেন না।


---


একদিন রাতে রায়হান নাদিয়াকে বলে,

— “তোমার গল্প নিয়ে একটা বই বের করতে চাই। তুমি লিখবে?”

নাদিয়া বলে,

— “তুমি লিখো, আমি বলি।”

— “চলো তবে, শুরু করি। নাম কী রাখবো?”

— “হতভাগা।”


রায়হান বিস্মিত হয়,

— “এই নাম?”

— “হ্যাঁ। কারণ প্রথম দিন থেকেই সবাই আমায় এই নামে ডেকেছে। এবার আমি এই নামকেই গর্বে পরিণত করবো।”


---


বই প্রকাশিত হয় ৬ মাস পরে। সাহিত্য মেলায় সেই বইয়ের স্টলে ভিড়—"হতভাগা: এক সাহসিনীর কাহিনি"। অনেকেই অটোগ্রাফ নেয়। কিছু লোক কাঁদে, কিছু হাসে, কিছু মুগ্ধ হয়। কেউ কেউ বলে,

— “আপনি শুধু লেখক না, আপনি যোদ্ধা।”


এমন সময় স্টলে আসে এক যুবক, তার চোখে কান্না, কণ্ঠ কাঁপা।

— “আপনি যদি আমার বোন হতেন, তাহলে আমি গর্ব করতাম। আমি আপনার মতো একজন মানুষের পাশে দাঁড়াতে চাই।”


নাদিয়া বলে,

— “তুমি পাশে থাকো, যাতে আর কোনো মেয়ে একা না পড়ে।”


---


এক সন্ধ্যায়, রায়হান ঘরে এসে দেখে নাদিয়া ছেলের হাতে একটা ছোট খেলনার গাড়ি দিয়ে বলছে,

— “জানো, বাবা একসময় তোমার জন্য একটা আসল গাড়ি কিনবে।”

ছেলেটা হাসে। ছোট্ট দাঁতগুলো ঝিলমিল করে।


রায়হান জানালার ধারে দাঁড়িয়ে ভাবে,

— “এই দুই প্রাণই এখন তার পৃথিবী। এই দুইজনই তাকে মানুষ করে দিচ্ছে। দায়িত্বশীল করে তুলেছে।”


সে ধীরে ধীরে এসে বলে,

— “আমি তোমাদের নিয়ে আরও কিছু করতে চাই। চাই, ‘হতভাগা’ নামে একটা সংগঠন গড়ি—যেখানে নির্যাতিত মেয়েরা কথা বলবে, লড়বে, নিজেদের মতো করে বাঁচবে।”


নাদিয়া বলে,

— “তোমার ভাবনাটা আমার নিজের মতো মনে হচ্ছে।”


তারা সিদ্ধান্ত নেয়, কাজ শুরু হবে আগামী মাস থেকে। গ্রামের পাশেই একটি পুরনো বাড়ি ভাড়া নেয়, যেখানে একটি সেল্টার হোম আর কাউন্সেলিং সেন্টার গড়ে তোলা হবে।


---


**শেষাংশে…**


সন্ধ্যা নামছে। আকাশ লালচে রঙ ছুঁয়ে নিচে নেমে আসছে। পাখিরা ঘরে ফিরছে। ঠিক তখনই, নাদিয়া বারান্দায় বসে ছেলেকে কোলে নিয়ে বলে,


— “শোনো, বাবু, আমি একদিন হতভাগা ছিলাম। সবাই সেই নামে ডাকত। কিন্তু আজ আমি একজন মা, একজন যোদ্ধা, একজন পথপ্রদর্শক। তুমি একদিন জানবে, তুই আমার সমস্ত হারিয়ে যাওয়া সম্মান ফিরিয়ে এনেছিস। আমি গর্ব করি তোর জন্য। আমি গর্ব করি আমার জীবনের জন্য।”


ছেলেটা হাত বাড়িয়ে বলে,

— “মা… মা…”


নাদিয়ার মুখে এক চিলতে হাসি, এক গভীর আত্মবিশ্বাস। সে জানে, জীবন তাকে ভেঙে ফেলতে পারেনি। সে জানে, এখন কেউ তাকে **“হতভাগা”** বললে সে গর্ব করে মাথা তুলে বলবে—

**“হ্যাঁ, আমি সেই হতভাগা, যে হার মানেনি।”**


---


**চলবে…

 পর্ব: ৪

গল্প: হতভাগা

লেখক: গিয়াস_উদ্দিন_আহাম্মদ

💝হতভাগা গল্পটি সম্পন্ন pdf নিতে চান তাহলে এ নাম্বার 01897682335 হোয়াটসঅ্যাপ বা ইমু করুন নাহলে পেইজে ইনবক্স করুন।

⭕শত্য প্রযোজ্য।



গল্প: হতভাগা পর্ব: ৩ লেখক: গিয়াস_উদ্দিন_আহাম্মদ

 



গল্প: হতভাগা
পর্ব: ৩
লেখক: গিয়াস_উদ্দিন_আহাম্মদ

ঘড়ির কাঁটা তখন রাত ১১টা ছুঁই ছুঁই। নাদিয়া জানালার পাশে দাঁড়িয়ে চাঁদের আলোয় নিজের প্রতিবিম্ব দেখছে। কিছুদিন আগেও এই জানালাটা ছিল তার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা—রায়হানের অপেক্ষায় প্রতিদিন বসে থাকত এখানেই। কিন্তু এখন?



এই জানালাটা থেকেই তো ঘরে ঢুকেছিল সেই অমানুষটা। এই জানালার দিকেই তাকিয়ে থাকলে তার গায়ে কাঁটা দেয়। চোখ বন্ধ করলেই মনে পড়ে সেই রাতের ভয়াবহতা। গায়ের প্রতিটি কোষে যেন এখনও সেই আতঙ্ক লেগে আছে।



পেছন থেকে রায়হান ধীরে ধীরে এসে বলে,
— “তুমি আজ খুব চুপচাপ, নাদিয়া। কেমন লাগছে তোমার এখন?”


নাদিয়া ধীরে বলল,
— “আমি জানি না। কখনো মনে হয় আমি বেঁচে আছি, কখনো মনে হয় যেন একটা ঘোরের মধ্যে আছি। তুমি পাশে না থাকলে হয়তো আমি শেষ হয়ে যেতাম।”


রায়হান ওর কাঁধে হাত রাখে,
— “তুমি সাহস দেখিয়েছো। এখন আমাদের লড়াই শুরু। শুধু অপরাধীকে ধরা পড়লেই সব শেষ হয় না। তোমাকে সমাজের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হবে। কারণ তুমি অপরাধী না, তুমি একজন ভুক্তভোগী, একজন যোদ্ধা।”


নাদিয়া একটু হেসে বলল,
— “যোদ্ধারা কি কাঁদে, রায়হান?”

— “হ্যাঁ, কিন্তু চোখের পানি দিয়ে তারা ঘাম মুছে নেয়।”

রায়হান ওর হাত ধরে।
— “আমি আছি, নাদিয়া। সব সময়।”



পরদিন সকালে থানায় আবার হাজির হয় রায়হান আর নাদিয়া। মামলার তদন্তকারী অফিসার ইন্সপেক্টর জাকির হোসেন খুব আন্তরিকভাবে তাদের গ্রহণ করে।

— “আপনার সাহসকে আমি সম্মান করি, ভাবি। অনেকেই মুখ খোলেন না। আপনি মুখ খুলেছেন, বিচার চাইছেন। আমরা আমাদের সর্বোচ্চটা করব।”


রায়হান প্রশ্ন করল,
— “কিন্তু ওই লোকটাকে ধরার পর কী করলেন আপনারা?”


— “আমরা তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। সে শুরুতে কিছুই বলছিল না। কিন্তু আজ সকালে সে স্বীকার করেছে, সে একা নয়, আরও দুইজন ছিল। এই ঘটনাটা ছিল পরিকল্পিত। তারা আগে থেকেই জানত বাড়িতে মেয়েটা একা থাকে।”


নাদিয়ার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে যায়,
— “মানে… এটা গ্যাং প্ল্যানড ছিল?”


— “হ্যাঁ। আমরা সেই দুইজনকে ধরার চেষ্টা করছি। তাদের নাম পাওয়া গেছে। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা।”


রায়হান মুখ শক্ত করে বলল,
— “আমরা বিচার চাই, স্যার। যেন আর কোনো নাদিয়াকে এমন নির্যাতনের শিকার না হতে হয়।”


ইন্সপেক্টর জাকির মাথা নোয়ালেন,
— “আমরা কাজ করছি, ভাই। সমাজ বদলাবে ধৈর্য আর সাহসের আলোয়।”



গ্রামে খবর ছড়িয়ে পড়ে—নাদিয়া মামলা করেছে, অপরাধী ধরা পড়েছে, এবং সে একা ছিল না। পুরো ঘটনা যে ধর্ষণ, তা বোঝার পর গ্রামের অনেকেই নাদিয়ার প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠে। রুবিনা নিজেই একদিন এসে বলে,


— “ভাবি, আমি তো কিছুই বুঝতে পারিনি সেদিন। আমি ভাবতাম, আপনি অন্যায় করেছেন। আমি ভুল করেছি।”


নাদিয়া বলে,
— “আপনি তো শুধু চোখে যা দেখেছেন সেটাই বলেছেন। কিন্তু সব সময় চোখে দেখা সত্য হয় না, তাই না?”


রুবিনা মাথা নিচু করে বলে,
— “আপনি যদি পারেন, আমাকে ক্ষমা করে দিন।”


নাদিয়া চোখ বন্ধ করে গভীরভাবে নিঃশ্বাস নেয়।
— “আমি আপনাকে দোষ দিই না। দোষ ওই সমাজের, যারা মেয়েদের চরিত্র নিয়ে আগে বিচার করে, তারপর প্রশ্ন করে।”



গল্পের মাঝেই চলতে থাকে মামলার শুনানি। অপরাধীরা একে একে ধরা পড়ে। আদালতে তাদের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয় নাদিয়াকে। সেই চাহনি, সেই চোখ—সবকিছুই যেন আবার তাকে সেই ভয়াল রাতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু এবার সে একা নয়। রায়হান, তানহা, এমনকি শাহিনুর বেগমও এবার তার পাশে।


শাহিনুর বেগম আদালতের সামনে দাঁড়িয়ে সাংবাদিকদের বলে,


— “আমি একটা ভুল করেছিলাম। আমি আমার ছেলের বউকে না জিজ্ঞেস করেই দোষী ভেবেছিলাম। আজ বুঝি, সমাজের বড় সমস্যা হলো—আমরা নারীদের দোষারোপ করতে খুব তাড়াতাড়ি করি। এবার থেকে আমি আর কোনো মেয়ে সম্পর্কে না জেনে কোনো কথা বলব না। বরং পাশে দাঁড়াবো।”


এই কথা শুনে চারদিকে প্রশংসা শুরু হয়। পত্রিকায় শিরোনাম হয়:


"একজন মা’র উপলব্ধি বদলে দিলো সমাজের চোখ"



মাস দুয়েক কেটে যায়। মামলার রায় ঘোষণা হয়। তিনজন আসামির প্রত্যেককে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আদালত বলে,


— “এই রায়ের মাধ্যমে আমরা একটি বার্তা দিতে চাই—নারী নির্যাতন কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। যারা নির্যাতনের শিকার, তারা যদি মুখ খোলে, তাহলে বিচার হয়—আজ তার উদাহরণ হলো এই রায়।”


আদালত কক্ষে উপস্থিত সবাই হাততালি দেয়।

নাদিয়ার চোখে জল, রায়হান ওর পাশে দাঁড়িয়ে বলে,
— “এটাই তোমার বিজয়, নাদিয়া।”


নাদিয়া বলে,
— “আমাদের বিজয়, রায়হান। আমাদের ভালোবাসা, বিশ্বাস, আর সাহসের জয়।”


গল্প এখানেই শেষ হতো যদি না সমাজ হতো আরও গভীর, আরও খোঁচাদায়ী।


যখন নাদিয়া সন্তান জন্ম দেয়, তখন হাসপাতালের নার্সরা কানে কানে কথা বলে,
— “এই সেই মেয়ে, যার ধর্ষণের ঘটনা এত শোরগোল তুলেছিল!”


পাশের বেডের রোগিণী বলে,
— “এই মেয়ের সাহস আছে, তবে লজ্জাও তো কিছু থাকা দরকার ছিল!”


নাদিয়া এসব শুনেও মুখ ফিরিয়ে রাখে। এবার সে আর কাঁদে না, ভেঙে পড়ে না। সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে শুধু বলে,


— “তুই আমার গর্ব, আমার সাহস। তুই কোনো পাপের সন্তান না, তুই ন্যায়ের প্রতীক। তোর জন্যই আমি লড়েছি। তুইই আমার নতুন ভোর।


গ্রামের স্কুলে নাদিয়া এখন মেয়েদের নিয়ে কাজ করে—সচেতনতা সেশনে নিজের গল্প বলে। ছোট ছোট মেয়েরা বলে,
— “ভাবি, আপনাকে দেখে সাহস পাই। যদি এমন কিছু হয়, আমরাও কথা বলব।”

রায়হান বলে,
— “তুমি শুধু একজন মা না, তুমি একটা প্রতীক—একটা প্রেরণা।”

তানহা সাংবাদিক হতে চায় এখন। বলে,
— “আমি ভাবির গল্প নিয়ে একটা ডকুমেন্টারি বানাবো। যাতে আরও মেয়েরা সাহস পায়।”


চলবে…
পর্ব: ৩
গল্প: হতভাগা
লেখক: গিয়াস_উদ্দিন_আহাম্মদ


 💝হতভাগা গল্পটি সম্পন্ন pdf নিতে চান তাহলে এ নাম্বার 01897682335 হোয়াটসঅ্যাপ বা ইমু করুন নাহলে পেইজে ইনবক্স করুন।

⭕শত্য প্রযোজ্য।


💝প্রিয় পাঠক, আপনার জন্য একটি ক্ষুদ্র অনুরোধ!


আপনি যখন আমার গল্পটি পড়ছেন, তখন শুধু একটি গল্পই নয়—আমার স্বপ্নকেও সমর্থন করছেন। গল্পের শেষে থাকা **মাত্র ৫ সেকেন্ডের বিজ্ঞাপনটি** ক্লিক করলে আমার সামান্য আয় হয়। ফেসবুক বা ওয়েবসাইট সরাসরি আয় দেয় না, কিন্তু **আপনার একটি ক্লিক** আমাকে নিয়মিত গল্প লিখতে অনুপ্রাণিত করে!  


এই ছোট্ট সহযোগিতাটুকুই আমার জন্য বিশাল। আপনার ভালোবাসা আর সমর্থন পেলে আমি আরও মন দিয়ে গল্প লিখতে পারব। ❤️  


**🔗 বিজ্ঞাপন লিঙ্ক:** 👇

https//wwwaddsadstaraadda.com


**#আপনার_এক_ক্লিক_আমার_অনুপ্রেরণা**  



✨ **ধন্যবাদ** আমার গল্পের পাশে থাকার জন্য!  





৪থ পর্ব লিংক👇

 https//mgugoloplikestorehotobagapartth


গল্প: হতভাগা পর্ব: ২ লেখক : গিয়াস_উদ্দিন_আহাম্মদ

গল্প: হতভাগা

পর্ব: ২
লেখক : গিয়াস_উদ্দিন_আহাম্মদ


💫

দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে তানহা একটানা কাঁদছে। ঘরের ভেতরের চিৎকার, থাপ্পড়ের শব্দ, নাদিয়ার কান্না—সব মিলে চারদিক যেন ভারী হয়ে উঠেছে। অথচ মাত্র এক ঘণ্টা আগেও এই বাড়ির পরিবেশ স্বাভাবিক ছিল।

রায়হান তখনও কিছুই জানে না। ফোনের ওপাশে মা হাউমাউ করে কেঁদে উঠেছে, কিন্তু স্পষ্ট কিছু বলছে না।

— "মা, কিছু বলো! এমন কী হয়েছে? তোমার গলাটা শুনেই তো আমি চিন্তায় পড়ে গেলাম।"
রায়হানের কণ্ঠ ভেঙে পড়ছে।

অবশেষে কাঁদতে কাঁদতে শাহিনুর বেগম বলে ওঠে,
— "তোর বউ, রায়হান... সে মা হতে চলেছে। কিন্তু তুই তো তিন বছর ধরে বিদেশে! তাহলে বল, এই পেটের সন্তান কার?"

ফোনের ওপাশে এক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা। তারপর শুধু একটা গভীর নিশ্বাস।

— "তুমি নিশ্চিত তো মা?"
— "রুবিনা দেখেছে। জানালা দিয়ে এক লোক ঢুকেছে নাদিয়ার ঘরে। আমি তো ভাবতেও পারিনি এমন হবে। আমি তো ওকে মেয়ের মতো দেখেছি। কিন্তু দেখ, কীভাবে বিশ্বাস ভেঙে দিলো!"

রায়হান কিছুক্ষণের জন্য চুপ। তারপর শান্ত গলায় বলে,
— "মা, তুমি একটু শান্ত হও। আমি আগামী সপ্তাহেই ফিরছি। আমি নিজে এসে সব বুঝে নেব। এখন নাদিয়াকে কিছু করো না।"

শাহিনুর বেগম ফোন নামিয়ে রাখে। কিন্তু মনের মধ্যে আগুন ধিকিধিকি করে জ্বলছে।


সন্ধ্যা নামে। তানহা চুপচাপ নাদিয়ার পাশে বসে। নাদিয়ার চোখ ফোলা, মুখ ফ্যাকাসে। কপাল ফাটা। ঠোঁটে রক্তের দাগ।

তানহা বলল,
— "ভাবি, তুমি সত্যিটা বলো। তুমি তো আমার বড় বোনের মতো। আমি জানি, তুমি এমন কিছু করতেই পারো না। কিন্তু যদি কিছু লুকিয়ে রাখো, তাহলে সেটা আরও খারাপ হবে।"

নাদিয়া চুপ। দুই চোখের কোণ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। ধীরে ধীরে বলে ওঠে,
— "তুই কি বিশ্বাস করিস তানহা, আমি কোনো পাপ করিনি?"

তানহা মাথা নাড়ে।
— "হ্যাঁ, আমি বিশ্বাস করি।"

— "তাহলে শোন... সেই রাতে খুব বৃষ্টি হচ্ছিল। মা তখন পাশের বাড়িতে গিয়েছিলেন। হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যায়। তখন দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ পাই। আমি ভাবলাম মা ফিরেছেন। দরজা খুলতেই দেখি রায়হানের মতো দেখতে একজন লোক দাঁড়িয়ে। আমি কিছু বোঝার আগেই সে জোর করে ঘরে ঢুকে পড়ে।"

তানহার চোখ ছানাবড়া।
— "মানে?"

— "হ্যাঁ। আমি চিৎকার করেছিলাম, কিন্তু কেউ শুনতে পায়নি। পুরো এলাকায় বিদ্যুৎ ছিল না। বাইরে বৃষ্টি, ভেতরে আমি একা... সে আমার মুখ চেপে ধরেছিল। আমি নিজেকে বাঁচাতে পারিনি। পরদিন জ্ঞান ফিরলে দেখি আমি ঘরের এক কোণে পড়ে আছি। আমার শরীর কাঁপছিল। মা কিছু জিজ্ঞেস করেছিল, কিন্তু আমি কিছু বলতে পারিনি। কারণ আমি জানতাম কেউ বিশ্বাস করবে না।"

তানহা স্তব্ধ হয়ে যায়।
— "তাহলে তুমি ধর্ষণের শিকার হয়েছো?"

নাদিয়া চোখ বন্ধ করে মাথা নাড়ে।
— "হ্যাঁ।"

— "তুমি থানায় যাওনি কেন?"

— "আমি সাহস পাইনি তানহা। তুমি তো জানো আমাদের সমাজ কেমন। সবাই বলবে আমি নিজের ইজ্জত নষ্ট করেছি। মা বিশ্বাস করত না। রায়হান হয়তো বলত, আমি ওকে ঠকিয়েছি। তাই চুপ করে গেছি।"

তানহা বলল,
— "কিন্তু ভাবি, চুপ থাকলে তো অপরাধী আরও সাহস পাবে! তুমি এইটা কাউকে বলোনি কেন?"

— "আমি তোকে বললাম আজ। কারণ তোকে আমার নিজের বোন মনে হয়।"

এই সময় দরজার বাইরে কিছু মানুষের কথাবার্তা শোনা যায়।

— "নাদিয়া নাকি বেইমানি করেছে!"
— "কী মেয়ে রে বাবা! এমন সুন্দরী, ভদ্র—সব নাটক ছিল বুঝি?"
— "মহিলাদের চরিত্র বোঝা মুশকিল।"

এই সব কথায় তানহা দাঁতে দাঁত চেপে রাগ সামলায়। বাইরে গিয়ে বলে,
— "আপনারা যদি নিজেদের পরিবার নিয়ে এমন কথা শুনতেন, ভালো লাগতো? দয়া করে গুজব ছড়াবেন না। সত্যি না জেনে কাউকে দোষারোপ করা অন্যায়।"

এক বৃদ্ধা বললেন,
— "তুই তো পিচ্চি, আমাদের শিখাতে এসেছিস?"

তানহা কাঁপা গলায় বলে,
— "না, আমি শুধু বলছি, একটু মানবতা দেখান। কেউ অন্যায় করলে বিচার হোক, কিন্তু গুজব ছড়িয়ে কারো জীবন নষ্ট করবেন না।"


এক সপ্তাহ পর।

রায়হান ফিরে এসেছে। মুখে চিন্তার ছাপ, চোখে গভীর বিষাদ। সে ঢুকেই দেখে মা কাঁদছেন, আর নাদিয়া এক কোণে বসে।

— "নাদিয়া, আমাকে সব বলো। সত্যিটা।"

নাদিয়া নিচু গলায় বলে,
— "আমি তোর উপর কোনোদিন বিশ্বাসঘাতকতা করিনি, রায়হান। যেটা হয়েছে, সেটা আমার ইচ্ছায় হয়নি। আমি নির্যাতনের শিকার।"

— "তুমি পুলিশে কেন যাওনি?"

— "আমি ভয় পেয়েছিলাম।"

রায়হান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে,
— "তুমি কি জানো, আমি এই তিন বছরে কতটা কষ্ট করেছি শুধু তোমার জন্য? মা প্রতিদিন কাঁদে, আমি তোমার কথা ভেবে রাত জেগে কাজ করেছি। আর ফিরে এসে এ খবর শুনলাম?"

— "তুমি চাইলে আমি চলে যাবো।"

— "না। তুমি কোথাও যাবে না। বরং আমরা থানায় যাবো। তোমার মেডিকেল করাতে হবে। তোমার কথা প্রমাণ করতে হবে। তোমার সম্মান ফিরিয়ে আনতে হবে।"

শাহিনুর বেগম এবার অবাক হয়ে যায়।
— "তুই এই মেয়েটার পক্ষে কথা বলছিস রায়হান?"

— "মা, আপনি তাকে গালি দিয়েছেন, মারধর করেছেন, অথচ একবারও তার কথা শোনেননি! আপনি কি জানেন, সে ধর্ষণের শিকার হয়েছে?"

শাহিনুর বেগম থমকে যান। এক মুহূর্তের জন্য যেন হাওয়া বন্ধ হয়ে আসে।

রায়হান ধীরে ধীরে মায়ের হাত ধরে বলে,
— "আপনি কি চাইতেন না, আমি দেশে ফিরে এসে সত্যিটা নিজে জেনে নেই? আপনি না হয় মায়ের মতো, কিন্তু বিচার না জেনে আপনি যদি অন্যায় করেন, তাহলে তো আপনি-ই অপরাধী হয়ে যান।"

শাহিনুর বেগম চোখে জল নিয়ে বলেন,
— "আমার ভুল হয়েছে রায়হান। আমি মেয়েটার মুখে সত্যিটা শোনার সুযোগও দিইনি।"

রায়হান নাদিয়ার দিকে তাকিয়ে বলেন,
— "তোমাকে আমি ছেড়ে যাবো না। তুমি সাহস করেছো আজ সত্যি বলার। এখন সাহস করে বিচার পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে।"



ঘটনাটা থানায় গড়ায়। তদন্ত শুরু হয়। নাদিয়ার বর্ণনার ভিত্তিতে স্কেচ তৈরি হয় সেই অপরাধীর। এলাকায় খোঁজ শুরু হয়।

রুবিনা একদিন থানায় গিয়ে বলে,
— "আমি যাকে জানালার কাছে দেখেছিলাম, সে এলাকায় নতুন এসেছিল। কিছুদিন কাজ করেছে, তারপর হঠাৎ উধাও হয়ে যায়। আমি এখন তার মুখ চিনতে পারবো।"

শেষপর্যন্ত অপরাধী ধরা পড়ে। DNA রিপোর্টেও প্রমাণ মেলে—বাচ্চার পিতা সেই অপরাধী।

নাদিয়ার চোখে জল, কিন্তু এবার সেটা লজ্জা বা দুঃখের নয়—বরং বিজয়ের, মুক্তির।


চলবে…
পর্ব: ২
গল্প: হতভাগা
লেখক: গিয়াস_উদ্দিন_আহাম্মদ


💝হতভাগা গল্পটি সম্পন্ন pdf নিতে চান তাহলে এ নাম্বার 01897682335 হোয়াটসঅ্যাপ বা ইমু করুন নাহলে পেইজে ইনবক্স করুন।

⭕শত্য প্রযোজ্য।


💝 প্রিয় পাঠক, আপনার জন্য একটি ক্ষুদ্র অনুরোধ!


আপনি যখন আমার গল্পটি পড়ছেন, তখন শুধু একটি গল্পই নয়—আমার স্বপ্নকেও সমর্থন করছেন। গল্পের শেষে থাকা **মাত্র ৫ সেকেন্ডের বিজ্ঞাপনটি** ক্লিক করলে আমার সামান্য আয় হয়। ফেসবুক বা ওয়েবসাইট সরাসরি আয় দেয় না, কিন্তু **আপনার একটি ক্লিক** আমাকে নিয়মিত গল্প লিখতে অনুপ্রাণিত করে!  


এই ছোট্ট সহযোগিতাটুকুই আমার জন্য বিশাল। আপনার ভালোবাসা আর সমর্থন পেলে আমি আরও মন দিয়ে গল্প লিখতে পারব। ❤️  


**🔗 বিজ্ঞাপন লিঙ্ক:** 👇

https//wwwaddsadstaraadda.com


**#আপনার_এক_ক্লিক_আমার_অনুপ্রেরণা**  



✨ **ধন্যবাদ** আমার গল্পের পাশে থাকার জন্য!  





৩য় পর্ব লিংক👇

 https//mgugoloplikestorehotobagapartth